সোমবার । ১৫ই জুন, ২০২৬ । ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩

বেনজীর অধ্যায় ও ক্ষমতার অহংকারের শেষ দৃশ্য

নিয়াজ মাহমুদ

বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা কেবল একটি ব্যক্তির উত্থান-পতনের গল্প নয়; বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য একটি আয়না হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের খবর তেমনই একটি ঘটনা। যদি সরকারের দেওয়া তথ্য, ইন্টারপোলের সহযোগিতা এবং দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের বিষয়টি সত্য ও প্রমাণিত হয়, তবে এটি শুধু একজন সাবেক পুলিশ প্রধানের আইনি সংকট নয়; এটি ক্ষমতা, জবাবদিহিতা এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ।

বাংলাদেশে বহু বছর ধরে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল, ক্ষমতাবানদের কিছু হয় না। সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের আইন, আর প্রভাবশালীদের জন্য আরেক ধরনের বাস্তবতা। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা অর্থনৈতিক শক্তি যেন অনেক ক্ষেত্রেই আইনের নাগালের বাইরে একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করে। ফলে জনগণের মধ্যে ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস জন্মেছিল যে রাষ্ট্রের বিচারিক ও প্রশাসনিক কাঠামো অনেক সময় শক্তিশালীদের বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে না।

এই প্রেক্ষাপটে একজন সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, একাধিক মামলা, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এবং অবশেষে বিদেশের মাটিতে গ্রেপ্তারের খবর নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। কারণ পুলিশের সর্বোচ্চ পদে আসীন একজন ব্যক্তি কেবল একজন কর্মকর্তা নন; তিনি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থার প্রতীক। সেই প্রতীকের বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয় শুধু একজন ব্যক্তি নয়, পুরো ব্যবস্থার জবাবদিহিতা।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ রাখা জরুরি। আইনের শাসনের মৌলিক নীতি হলো, কোনো ব্যক্তি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে তাকে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করা যায় না। বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। অভিযোগ, তদন্ত, বিচার এবং রায়, এই চারটি ধাপের মধ্য দিয়েই সত্য প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এতদূর পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়া অগ্রসর হওয়াটাই একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, বিরোধী মত দমনের অভিযোগ। এসব বিষয় বহু বছর ধরে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের অনেকগুলোরই চূড়ান্ত বিচার হয়নি। ফলে জনগণের মনে নানা প্রশ্ন জমা হয়েছে। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো একটি গ্রেপ্তার দিয়ে মিলবে না। কিন্তু এই ঘটনা অন্তত একটি বার্তা দেয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিরাও আইনি তদন্তের বাইরে নন।

ক্ষমতা মানুষের মধ্যে এক ধরনের অজেয়তার অনুভূতি তৈরি করে। ইতিহাসে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে তারা অপরাজেয়। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো, ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়। রাজনৈতিক সরকার বদলায়, প্রশাসনিক প্রভাব কমে যায়, সময়ের ¯্রােতে অনেক শক্তিশালী মানুষও সাধারণ নাগরিকের অবস্থানে নেমে আসেন। তখন তাদের সামনে দাঁড়াতে হয় সেই আইনের, যার প্রয়োগ একসময় তারা নিজেরাই তদারকি করতেন।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য এই ঘটনায় একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রের কর্মচারী; কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায়, কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যায়। যারা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেন, তারা সাময়িক সুবিধা পেতে পারেন; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই সিদ্ধান্তই তাদের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে।

এ কারণেই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশকে ‘সরকারের পুলিশ’ নয়, ‘জনগণের পুলিশ’ হিসেবে দেখা হয়। পুলিশ বাহিনীর মূল দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ করা এবং সংবিধানের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা। যখন কোনো বাহিনী বা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক আনুগত্যকে পেশাগত দায়িত্বের ওপরে স্থান দেয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। বর্তমান বিশ্বে কোনো ব্যক্তি বিপুল সম্পদ নিয়ে বিদেশে চলে গেলেই নিরাপদ থাকবেন, এমন ধারণা ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারি, তথ্য আদান-প্রদান এবং আন্তঃরাষ্ট্র সহযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। ফলে দুর্নীতি, অর্থপাচার কিংবা অন্যান্য অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য বিদেশ সব সময় নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠছে না।

তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি সতর্কতাও প্রয়োজন। কারণ একটি গ্রেপ্তার যদি কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি আইনের শাসনের বিজয় নয়। আবার যদি এটি নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং প্রমাণভিত্তিক আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা।

আরেকটি মানবিক দিকও রয়েছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে, কিন্তু তার পরিবারকে সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা সভ্য সমাজের কাজ নয়। ব্যক্তি তার কাজের জন্য দায়ী; পরিবার নয়। আইনের শাসন মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়, বরং ন্যায়বিচারের সীমারেখা অতিক্রম না করাও।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আইনের শাসনের প্রশ্নে বহু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জনগণ এখন আর কেবল প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফলাফল দেখতে চায়। তাই বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার যদি সত্যিই আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের উদাহরণ হয়, তাহলে এটি একটি ইতিবাচক সূচনা হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত বিচার কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য হয় তার ওপর।

শেষ পর্যন্ত এই ঘটনাকে একজন ব্যক্তির পতনের গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে রাষ্ট্রের জন্য একটি পরীক্ষা। বাংলাদেশ কি সত্যিই এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ক্ষমতা, পদমর্যাদা ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে? নাকি এটি কেবল আরেকটি আলোচিত রাজনৈতিক অধ্যায় হয়ে ইতিহাসে হারিয়ে যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। তবে আপাতত একটি সত্য স্পষ্ট, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, পদও নয়। স্থায়ী হওয়া উচিত কেবল আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।

এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন আমি ফ্রান্সের লিয়ন শহরে অবস্থান করছি। কাকতালীয়ভাবে এই শহরেই অবস্থিত ওঘঞঊজচঙখ-এর সদর দপ্তর। লিয়নের এই শহরে বসে দুবাইয়ে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের খবর নিয়ে লিখতে গিয়ে বারবার একটি কথাই মনে হয়েছে, ক্ষমতা কারও চিরস্থায়ী নয়।

এক সময় যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার অন্যতম প্রতীক ছিলেন, যিনি আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, আজ তাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া, রেড নোটিশ ও গ্রেপ্তারের আলোচনা। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই, ক্ষমতা মানুষের হাতে সাময়িকভাবে আসে, কিন্তু জবাবদিহিতা থেকে কেউ চিরদিন পালিয়ে থাকতে পারে না।

বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছে এই গ্রেপ্তারের খবর তাই শুধু একটি আইনি ঘটনা নয়; এটি একটি প্রতীকী বার্তা। এমন একটি বার্তা, যা মনে করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হলে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে প্রভাব, প্রতিপত্তি কিংবা ক্ষমতার বলয়ও একদিন ভেদ করা সম্ভব। সেই কারণেই আলোচিত এই গ্রেপ্তারের খবর অনেক বাংলাদেশি নাগরিকের কাছে স্বস্তি, আশাবাদ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার একটি ইতিবাচক সংবাদ হয়ে উঠেছে।

লেখক : প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন